বৃহস্পতিবার, ১৭ Jun ২০২১, ১০:২৯ অপরাহ্ন

কাশবনের ইতিকথা পর্ব ৫ — আসলাম আহমেদ খান

কাশবনের ইতিকথা পর্ব ৫ — আসলাম আহমেদ খান

 

সাধারণ মানুষের ভাবনার ভিত্তিভূমি নির্মাণে পরিবারের পর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, জাতির গর্বিত সন্তানরা বিপরীত স্রোতে চলতে ভালোবাসে- এমন একটি কথাও প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, “একটা জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষ যারা, তারা সে জাতির সাধারণ মানুষের যে বৈশিষ্ট্য, তার বিপরীত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়”।

 

 

 

 

কবি নির্মলেন্দু গুণ সে পথেরই যাত্রী ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁকে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দু’ভাবেই প্রভাবিত করেছে। আমার কথা শুনে পাঠকের ভাবনায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন উঁকি দেওয়া স্বাভাবিক। সে প্রশ্নের মীমাংসা মিলবে কবির কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আলোচনায়। তার আগে, ঘুরে আসি প্রিয় কবির স্কুল থেকে।

প্রিয় পাঠক, এবারের পর্ব জুড়ে থাকবে আমার লিখার অদৃশ্য প্রম্পটার, কবি নির্মলেন্দু গুণের স্কুল জীবনের কথামালা।

 

 

 

 

 

কবির স্কুল জীবন শুরু তৃতীয় শ্রেণী থেকে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে অটো পাশ। বাড়ির আশেপাশে কোন পাঠশালা না থাকায়, মা চারুবালার কাছেই সম্পন্ন হয় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীরপাঠ। ১৯৫৪ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন বারহাট্টা থানা সদরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘করনেইশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনিস্টিটিউশনের’ প্রাথমিক শাখায়, যেটি বর্তমানে বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নাম ধারণ করে আছে।

 

 

 

 

 

শুরুতে স্কুলটির অবস্থান ছিল গোপালপুর বাজারের কোন এক স্থানে ( তখনকার গৌরিপুর বাজারে)। বৃ-কালিকা গ্রামের দানশীল শিক্ষানুরাগী মোহিনী মোহন গুণ তাঁর স্বর্গীয় পিতা জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ গুণের নামানুসারে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টির নামকরণের সঙ্গে বৃটিশ ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান ও আনুগত্যের বিষয়টি ছিল স্পষ্ট। নামকরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন অনুশীলনকারীরা স্কুলটি পুড়িয়ে দিয়েছিলো। অবশ্য ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের আড়ালে বৃ-কালিকার গুণদের প্রতি গড়মার গুণদের গোপন ঈর্ষার কথাও শোনা যায়। জনশ্রুতি আছে, সেই ঈর্ষা চরিতার্থের মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গড়মা গ্রামের জানকি গুণ এবং কুমোদ গুণ।

 

 

 

 

গুণ বংশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্মের সাতকাহন স্কুলেরই সাবেক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষ্যে শুনি:
“ আমার ইশকুলের নাম বারহাট্টা সি.কে.পি. ইনিস্টিটিউশন। সবাই নামটা সংক্ষেপ করে বলেন, বারহাট্টা হাইস্কুল। এটা হচ্ছে আমার ইশকুলের ডাকনাম। তার আসল নামটা শুরুতে বলেছি। ইনিস্টিটিউশন শব্দটার অর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠান।

 

 

 

 

 

ইশকুলের নামের সঙ্গে এই শব্দটা যুক্ত হলে আমরা ইনিস্টিটিউশন শব্দটাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ইশকুল অর্থেই ধরে নিই। সিকেপি শব্দটার অর্থ, আমার আশঙ্কা অনেকেই জানেন না, জানবার কথাও নয়। ‘সি’ হচ্ছে ইংরেজী করনেইশন শব্দের আদ্যক্ষর, যার অর্থ হচ্ছে রাজ্যভিষেক। রাজা বা রানির সিংহাসনে আরোহণের অভিষেক অনুষ্ঠান। প্রশ্ন উঠতে পারে, ইশকুলের সঙ্গে রাজা-রাণীর অভিষেক অনুষ্ঠানের সম্পর্ক কী ? সম্পর্ক আছে। সেটা আমাদের অতীত ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজা পঞ্চম জর্জ যখন ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন বৃটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত বারহাট্টার জমিদার মোহিনী মোহন গুণ মহাশয় ব্রিটিশ-ভারতের কবি রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরের বছর, ১৯১৪ সালে তাঁর পিতা কৃষ্ণপ্রসাদ গুণের নামে বারহাট্টায় একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সমগ্র ব্রিটিশ-ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশরাজার অভিষেক উপলক্ষে নানাবিধ আনন্দ-অনুষ্ঠানের ধুম লেগেছিল। নতুন ব্রিটিশরাজের প্রতি প্রীতি ও আনুগত্য প্রকাশের উদ্দ্যেশে মোহিনী মোহন তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির নামের সঙ্গে ‘করনেইশন’ শব্দটিও যুক্ত করেন।

 

 

 

 

 

সেই সময় প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যেই ব্রিটিশরাজের প্রতি আনুগত্যসূচক এই করোনেইশন শব্দটা যুক্ত রয়েছে। এই হচ্ছে সিকেপি’র ‘সি’ বর্ণটির ব্যাখ্যা। আর ইংরেজী ভাষায় লিখিত কৃষ্ণ’র আদ্যক্ষর ‘কে’ এবং প্রসাদের আদ্যক্ষর ‘পি’ নিয়ে নির্মিত হয়েছে কেপি। বারহাট্টা করনেইশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনিস্টিটিউশন।
জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলঘরটি পর পর দুটি পরিকল্পিত অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত হয়। শুরুতে স্কুলটি ছিল সহজদাহ্য ছন দিয়ে তৈরি। ফলে সেটি পুড়িয়ে ফেলতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। নির্বিকার অগ্নির পক্ষে তো আর জানার কথা নয় যে সে স্কুল পোড়াচ্ছে। দাহ্যবস্তুর মধ্যে নিজের ভেতরের গুপ্তশক্তির প্রকাশ দেখেই সে মুগ্ধ। পরে কাঠের কাঠামোর ওপর টিন দিয়ে স্কুলটিকে পুননির্মান করা হয়। তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। আবারও স্কুলটি আগুনের মুখে পড়ে। এবার টিনের বেড়া ও চাঙে কেরোসিন ঢালার পাশাপাশি কেরোসিনে চোবানো কাপড় লটকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভেতরের ধরনার সঙ্গে, যাতে দাহ্যবস্তুর অভাবে আগুন নিভে না যায়। তাতে ভালো ফল পাওয়া যায়। স্কুলঘরটি এবারও পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়।

 

 

 

 

 

মোহিনী গুণও দমার পাত্র নন। তিনি এবার কলকাতা থেকে টাটা কোম্পানির লোকজন আনিয়ে, লোহার কাঠামো এবং রক্তলাল রঙের টিন দিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত করে বর্তমান কাঠামোর এই স্কুলটি তৈরি করেন।
রহস্যজনক দুটি অগ্নিকান্ডের পেছনেই পার্শ্ববর্তী গড়মা গ্রামের জানকী গুণ মহাশয় জড়িত ছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু আদালতে মামলা করেও স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের পক্ষ থেকে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।”

 

 

 

 

 

প্রতিষ্ঠা লগ্নের শুভ সূচনায় অশুভ শক্তির কালোছায়া ভেদ করে স্কুলটি আজ শতবর্ষ পেরিয়ে বারহাট্টা তথা অত্র অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, জাতীয় অধ্যাপক ড. ইন্নাস আলী, রাজনীতিবিদ ; গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি আজিজুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ডি.আই.জি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্ত সংস্থার প্রধান মুহ: আবদুল হাননান খান, সাবেক কর কমিশনার ও সচিব মতিউর রহমান খান, সাবেক সচিব হেলাল উদ্দিন খান, সাবেক সচিব নূরুন্নবী তালুকদার সহ অনেক জ্ঞানী গুনি মানুষ। এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী প্রজন্মের অগণিত শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ পেশায় গৌরবের সাথে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বারহাট্টার মর্যাদা বৃদ্ধি করে চলেছেন। শিক্ষকতা করেছেন বাংলা একাডেমি ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রাপ্ত দার্শনিক অধ্যাপক যতীন সরকারের মতো গুণীজনেরা।

 

 

 

 

 

কাশবনের কালো মাটির পথ ধরে, দেড় মাইল হেঁটে স্কুলে যাতায়ত করতেন কবি। সে সময় দেড় মাইল হেঁটে স্কুলে যাওয়া খুবই মামুলি একটা বিষয় ছিলো। কেউ কেউ ৬/৭ মাইল হেঁটেও ছাত্ররা স্কুলে আসতো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী রাজেন্দ্র সরকার প্রতিদিন মোহনগন্জ থেকে আসা যাওয়া মিলিয়ে ১৪ মাইল পথ হেটে স্কুলে যাতায়ত করতেন। হাঁটার পথও মসৃণ ছিল না। শুকনা মৌসুমে কেউ কেউ বাইসাইকেল চালিয়েও আসলেও, বর্ষাকাল ছিল বৈরী সময়। বৃষ্টির হাত থেকে মাথা রক্ষার জন্য ছাতা থাকলেও শরীর ভিজতো খাল কিংবা ভাংতি পার হওয়ার সময়। কোথায়ও কোথায়ও সাঁকোর ব্যবস্থা থাকলেও, সে ব্যবস্থায় ছেদ পড়তো প্রায়শই। বিনা নোটিশে উধাও হয়ে যেতো সাঁকোর হাতল কিংবা বাঁশ। তখন কাপড় ভেজানো ছাড়া পার হওয়ার বিকল্প খুব কমই ছিল। বেশী দুরের ছাত্ররা আশেপাশের অবস্থা সম্পন্ন কৃষক পরিবার ও শিক্ষানুরাগীদের বাড়িতে লজিং থাকতো, বিনিময়ে বাড়ির ছেলে- মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হতো। অনেক শিক্ষকও লজিং থাকতেন। তাদেরকে বলা হতো লজিং মাস্টার। সবচে বেশী সমস্যা হতো মেয়েদের। ছেলেদের কেউ কেউ লজিং বা জায়গীর থাকার সুযোগ পেলেও মেয়েদের জন্য তা ছিল অকল্পনীয়। সে সময়ে নারী শিক্ষার হার কম হওয়ার এটাও ছিল একটা বড় কারণ। কবি যখন হাইস্কুলে পড়তেন, তখন তাঁর ক্লাসে ৪২ জন ছাত্রের বিপরীতে ছাত্রী ছিলেন মাত্র দুইজন। কবির ক্লাসমেট এবং সি.কে.পি. উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাসিম তালুকদারের তথ্যমতে, সে দু’জন ছাত্রীর একজন হলেন নীলিমা, অপরজন লাইলী। নীলিমা ছিলেন আসমা বাজার নিবাসী জনৈক পরিমল বাবুর কন্যা। লাইলী ছিলেন বারহাট্টা থানায় কর্মরত জমাদারের মেয়ে। কবির অন্যান্য সহপাঠীদের মধ্যে রয়েছেন কাজী আব্দুল ওয়াহেদ( বড়ি), হেলাল উদ্দিন খান (ফুলবাড়িয়া), মতিউর রহমান খান ( কামালপুর), রন্জিত মজুমদার (গণেশ ডাক্তারের ছেলে), হোসেন আলী ( গাভারকান্দা), বিজন সরকার (ধলাপাড়া) আতাউর রহমান( ধলাপাড়া), শহিদ উদ্দিন (ডেমুরা), বিমল সরকার (নন্দুরা), ফজলুর রহমান আকন্দ (ছালিপুরা), আব্দুল মতিন (দশহাল), পিযুষ সরকার (আটপাড়া)।

 

 

 

 

 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কবির অন্যান্য শিক্ষকরা ছিলেন:
ইসপিন্জারপুর গ্রামের মো: নজর আলী, যিনি প্রতিদিন ক্লাশ শুরুর আগে ড্রিল করাতেন।উনার সুন্দর হাতের লিখার ভক্ত ছিলেন কবি।
ছমির উদ্দিন খান, গ্রামের বাড়ি আসমা হলেও, স্কুলের পেছনে পুকুর পাড়ে উনার বাসা ছিল, ওখানেই থাকতেন।

দশাল গ্রামের অধ্যাপক আব্দুল মতিন সাহেবের বড় ভাই মো: ইউনুছ আলী মাস্টার। কবির বর্ণনায় উনি ছিলেন গৌরবর্ণের, দেখতে অবিকল নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার মতো। প্রতিদিন চোখে সুরমা দিয়ে স্কুলে আসতেন।

গুহিয়ালা গ্রামের জগদীশ চন্দ্র সরকার, চাঁপারকোনা গ্রামের শচীন্দ্র বিশ্বাস ছিলেন কবির হাইস্কুল শাখার নিয়মিত শিক্ষক।
কিছুদিনের জন্য শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আটপাড়া থানার ছয়াশি গ্রামের অধ্যাপক আহাম্মদ হুসেন এবং বারহাট্টা সংলগ্ন কামালপুর গ্রামের ন্যাপ নেতা এডভোকেট আব্দুল আহাদ খানকে। আহাদ খান পরবর্তীতে শিক্ষকতা ছেড়ে আইন পেশায় এবং আহাম্মদ হুসেন নেত্রকোণা কলেজে অধ্যাপনা পেশায় যোগদান করেন।
কবির হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন কেন্দুয়া থানার ধীরেন্দ্র চক্রবর্তী, যিনি প্রতিদিন ভোরে স্নান ও পূঁজা শেষে পুষ্প চন্দন মাথায় দিয়ে স্কুলে আসতেন। মুসলমান ছাত্রদের ইসলাম ধর্ম পড়াতেন মৌলানা মো: মোবারক আলী শাহ্ ( ধর্মপাশা থানার সিংহপুর গ্রামের)।

গণিতের শিক্ষক ছিলেন কিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক শ্যামল গুণ এর পিতা মনীন্দ্র চন্দ্র গুণ, যিনি ‘চিনি গুণ’ নামেই সমধিক পরিচিত। চিনি গুণ মহাশয়ের ক্লাসরুমেই নির্মলেন্দু গুণের কবি জীবনের সূচনা। কিশোর নির্মল তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ছাত্রদের ব্যস্ত রাখার কৌশল হিসেবে স্যার সবাইকে কবিতা লিখতে বলেছিলেন। সবাই সেদিন সাদা পাতা জমা দিলেও,নির্মলেন্দু গুণ লিখেছিলেন-

“আমি এখন পড়ি যে ভাই বারহাট্টা হাই স্কুলে,
একে-অন্যে থাকি হেথায় ভাই-বন্ধু বলে।
এই স্কুলটি অবস্থিত কংস নদের তীরে,
আমাদের বাড়ি হইতে দেড় মাইল উত্তরে।”

কবিতা শুনে ছাত্রদের সামনে হাসতে অনভ্যস্ত মনীন্দ্র স্যার মৃদু হেসে কবিতা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই স্বীকৃতি-ই ছিল কবির কবিতা লিখার অনুপ্রেরণা । এ বিষয়ে এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে কবি বলেন- “যে স্যারের মুখে ছাত্ররা কোনদিন হাসি দেখেনি, সেই স্যার কবিতা শুনে হেসেছেন, তাহলে কবিতার নিশ্চয়ই এমন কোন শক্তি আছে যা মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারে” !

হাইস্কুল শাখায় কবির প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মুখলেছুর রহমান। যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানা থেকে শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন। কবির মতে, শিক্ষক হিসেবে উনিই প্রথম কবির মানসপটে আধুনিকতার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। উনার চাল-চলন,কথা-বার্তা, আচার-আচরণ সবই ছিল অনুসরণীয়। উনিই প্রথম জীবনানন্দ দাসের কবিতার সঙ্গে ছাত্রদের পরিচিত করেছিলেন। সাহিত্য চর্চার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘নবারুন সাহিত্য মজলিশ’ নামে এক সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যোগেই বারহাট্টাতে প্রথম বারের মতো ডায়নামো চালিয়ে বিদ্যুতের আলোয় রবীন্দ্র- নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করা হয়। ক্লাসরুমে পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই জীবনানন্দ দাশের কবিতা আবৃত্তি করে তিনি ছাত্রদের শুনাতেন। প্রচন্ড অত্মমর্যাদা সম্পন্ন এই ব্যক্তিটি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির কিছু সদস্যের সাথে বনিবনা না হওয়ায় চাকুরী ছেড়ে চলে যান। উনার বিদায়ের সংবাদে ছাত্রদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। অশ্রু সজল নয়নে সমস্ত ছাত্ররা রেল স্টেশনে ছুটে গিয়েছিল প্রিয় শিক্ষককে বিদায় দেয়ার জন্য। বিদায় বেলায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে হাত উঁচিয়ে বলেছিলেন-
“ আবার আসিব ফিরে…”
কিন্তু ফেরা হয়নি আর…!
১৯৭১ সালে রাজাকারদের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া একটি গ্রেনেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে উনার গায়ে পড়ে এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু বরণ করেন।

মুখলেছুর রহমান স্যার চলে যাওয়ার পর বাংলা ক্লাশ ছাত্রদের ভাল লাগতো না।বছরখানেক পর বাংলা একাডেমি এবং স্বাধীনতা দিবস পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন সর্ব-বিষয়ে পন্ডিত্যের অধিকারী যতীন সরকার অল্প সময়ের মধ্যেই মুখলেছুর রহমানের অভাব পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

স্কুলের পাশাপাশি টোলেও পড়েছেন কবি। ‘টোল, চতুষ্পাঠী ও মক্তব’ – এগুলো ছিলো বাঙালির একান্ত নিজস্ব পাঠশালা। সাধারণত: হিন্দুরা টোলে এবং মুসলমানেরা মক্তবে যেতো। শুরুতে এই টোল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও, পরবর্তীতে সকল বর্ণের হিন্দুদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বৃটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও টোলের অস্তিত্ব ছিলো। বারহাট্টার একমাত্র টোলের অধ্যক্ষ ছিলেন ডাক্তার হরেন্দ্র গোস্বামী কাব্য ব্যকরণ তীর্থ। হরেন্দ্র গোস্বামী পরিচালিত এই টোলটি ছিল কলিকাতা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতপ্রাপ্ত। পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষাবোর্ড এবং স্বাধীন বাংলাদেশ কর্তৃকও স্বীকৃত ছিলো। এক সময় সংস্কৃত ও বাংলা ব্যকরণের শিক্ষক হওয়ার জন্য টোলের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হতো। হরেন্দ্র গোস্বামীর এই টোলে পড়েই, কবি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সংস্কৃতিতে লেটারমার্ক পেয়েছিলেন। হরেন্দ্র গোস্বামী ছিলেন বারহাট্টার স্বনামধন্য কবিরাজ। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি নিজ চেম্বারে টোলের ছাত্রদের পড়াতেন। চিকিৎসা ও শিক্ষার পাশাপাশি বারহাট্টার সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাতিঘর ছিলো হরেন্দ্র গোস্বামীর চেম্বার। প্রতি সন্ধ্যায় বারহাট্টার প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের আড্ডা বসতো এখানে। ন্যাপ জাতীয় কমিটির সাবেক সভাপতি আজিজুল ইসলাম খান, কবির শিক্ষক অধ্যাপক যতীন সরকার, মুখলেছুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা আড্ডায় নিয়মিত উপস্থিতি থাকতেন।
(চলবে)

৮ জুন ২০২১
নিউ ইয়র্ক।

•• এ পর্বটি লিখতে তথ্য ও ছবি দিয়ে সহায়তা করেছেন
কবির বন্ধু ও সহপাঠী ,বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক, আব্দুল হাসিম তালুকদার
কবি মনোয়ার সুলতান
ব্যাংকার মোহাম্মদ ইউনুছ
অধ্যাপক সাইফুল আলম নোমানী
বিলকিস আক্তার রেহেনা
মাসুদ আহসান টিপু
মোস্তাফিজুর রহমান মন্জু
প্রণব চন্দ্র সরকার
মানস গুণ
প্রবীর দেবনাথ

মাহবুবুর রহমান

সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ।





আজকের নামাজের সময়সূচী

    Dhaka, Bangladesh
    বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৩:৪৪
    সূর্যোদয়ভোর ৫:১১
    যোহরদুপুর ১১:৫৯
    আছরবিকাল ৩:১৭
    মাগরিবসন্ধ্যা ৬:৪৭
    এশা রাত ৮:১৫

স্বর্ণা যুব সমবায় সমিতি লিঃ

পুরাতন সংবাদ

শুক্র শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
©2019PROTHOM SOKAL24. All rights reserved.
Design BY PopularHostBD